শিকারকে প্রায়শই বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে প্রচার করা হয়। যুক্তি দেওয়া হয় যে, শিকার থেকে প্রাপ্ত অর্থ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ প্রকল্পে ব্যবহার করা হয় এবং শিকার করা প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখা হয়। কিন্তু এই ধারণাটি কি সত্যিই সত্য? বিশেষ করে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মতো নদীমাতৃক এবং জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ অঞ্চলে, যেখানে ঐতিহ্যগতভাবে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করে আসছে, সেখানে শিকারকে সংরক্ষণের হাতিয়ার হিসেবে দেখা কতটা যুক্তিযুক্ত? এই প্রবন্ধে আমরা ১১টি কারণ খতিয়ে দেখব কেন শিকার আসলে সংরক্ষণ নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে এর পরিপন্থী। ১. বন্যপ্রাণীর সংখ্যা হ্রাস করে, বৃদ্ধি করে না শিকারের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ফলাফল হল প্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়া। যদিও সীমিত আকারে শিকারকে 'টেকসই' বলে দাবি করা হয়, বাস্তবে অনেক শিকার প্রায়শই অতিরিক্ত হয়। যখন একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির প্রাণীর সংখ্যা ইতিমধ্যেই কম থাকে, তখন শিকার সেই প্রজাতিকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশেষ করে বিপন্ন বা বিরল প্রজাতির ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি প্রযোজ্য। সুন্দরবন বা উত্তরবঙ্গের অরণ্যে অনেক প্রজাতি ইতিমধ্যেই সংকটাপন্ন। ২. বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করে প্রতিটি প্রাণী বাস্তুতন্ত্রের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিকারের মাধ্যমে যখন কোনো নির্দিষ্ট প্রজাতির প্রাণী অপসারণ করা হয়, তখন খাদ্য শৃঙ্খলে তার প্রভাব পড়ে। যেমন, শিকারী প্রাণীর সংখ্যা কমে গেলে তাদের শিকার হওয়া প্রাণীর সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে, যা উদ্ভিদের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। আবার, শিকার হওয়া প্রাণীর সংখ্যা কমে গেলে তাদের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত উদ্ভিদ বা অন্যান্য প্রাণীর সংখ্যাও প্রভাবিত হতে পারে। এই জটিল ভারসাম্য নষ্ট করা সংরক্ষণের উদ্দেশ্য হতে পারে না। ৩. নৈতিকতার প্রশ্ন বাস্তবতার নিরিখে, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রাণীদের জীবন রক্ষা করা, তাদের জীবন কেড়ে নেওয়া নয়। শিকারের মাধ্যমে প্রাণীদের যন্ত্রণা ও মৃত্যু দেওয়া হয়, যা কোনোভাবেই নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। একটি প্রাণী কেবল একটি সম্পদ নয়, বরং একটি সংবেদনশীল সত্তা। তাদের প্রতি এই ধরনের আচরণ চরম নিষ্ঠুরতা। এই বিষয়টি নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রাণী অধিকার কর্মীরা সোচ্চার। "প্রাণীদের জীবন কেড়ে নেওয়া কোনোভাবেই সংরক্ষণের অংশ হতে পারে না। এটি তাদের প্রতি নিষ্ঠুরতা মাত্র।" ৪. সংরক্ষণ তহবিলের অপব্যবহারের সম্ভাবনা শিকার থেকে প্রাপ্ত অর্থ সংরক্ষণে ব্যবহৃত হওয়ার কথা বলা হলেও, অনেক ক্ষেত্রে এই অর্থের স্বচ্ছতা থাকে না। দুর্নীতি বা অব্যবস্থাপনার কারণে সেই অর্থ বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় কাজে না লেগে অন্য খাতে চলে যেতে পারে। ফলে, শিকারের নামে আসলে বন্যপ্রাণী ধ্বংসের একটি প্রক্রিয়া চলতে থাকে, যা সংরক্ষণের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে। তহবিলের স্বচ্ছতা একটি বড় প্রশ্ন: শিকার থেকে প্রাপ্ত অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রায়শই একটি চ্যালেঞ্জ, যা সংরক্ষণের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ৫. অবৈধ শিকারকে উৎসাহিত করে যখন শিকার বৈধ করা হয়, তখন এটি অবৈধ শিকারীদের জন্য একটি ছদ্ম আবরণ তৈরি করে। বৈধ শিকারের আড়ালে তারা অনেক সময় নিষিদ্ধ প্রজাতির প্রাণী শিকার করে বা অতিরিক্ত শিকার করে। এর ফলে বন্যপ্রাণীর চোরাচালান ও অবৈধ বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়, যা সংরক্ষণের প্রচেষ্টাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী পাচার একটি বড় সমস্যা। ৬. স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংঘাত অনেক সময়, শিকারের লাইসেন্স প্রদান বা শিকারের অধিকার দেওয়া হয় বহিরাগত বা ধনী ব্যক্তিদের, যারা স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে বন্যপ্রাণী ভাগাভাগি করতে চায় না। এটি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয়। পরিবর্তে, যদি স্থানীয় সম্প্রদায়কে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করা হয় এবং তাদের ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানকে সম্মান জানানো হয়, তবে তা আরও কার্যকর সংরক্ষণ পদ্ধতি হতে পারে। ৭. পর্যটন ও পরিবেশগত শিক্ষার সুযোগ হারানো জীবিত বন্যপ্রাণী পর্যটন এবং পরিবেশগত শিক্ষার এক বিশাল উৎস। দর্শনার্থীরা বন্যপ্রাণীকে তাদের স্বাভাবিক পরিবেশে দেখতে ভালোবাসেন। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন স্থানীয় অর্থনীতি উপকৃত হয়, তেমনই মানুষ পরিবেশ ও প্রকৃতি সম্পর্কে সচেতন হয়। শিকার এই সুযোগগুলো নষ্ট করে দেয়। একটি মৃত প্রাণীর চেয়ে একটি জীবন্ত প্রাণী অনেক বেশি মূল্যবান, যা প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। ৮. শিকারের জন্য প্রাণীর প্রজনন ও পালন কিছু ক্ষেত্রে, শিকারের জন্য নির্দিষ্ট প্রজাতির প্রাণীকে খামারে পালন করা হয়। এই পদ্ধতিটি বন্য পরিবেশের বাস্তুতন্ত্রের কোনো উপকারে আসে না, বরং এটি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ধারণাকে বাণিজ্যিকীকরণের দিকে ঠেলে দেয়। প্রাণীদের কেবল 'পণ্য' হিসেবে দেখা হয়, যাদের জীবন ও মৃত্যুর উপর মানুষের অধিকার রয়েছে। এটি বন্যপ্রাণীর প্রকৃত সুরক্ষার পরিপন্থী। শিকারের জন্য পালন করা প্রাণীর সংখ্যা (আনুমানিক) বিশেষ প্রজাতির হরিণ: প্রায় ৫০,০০০. বিভিন্ন পাখি: প্রায় ২,০০,০০০. অন্যান্য ছোট প্রাণী: প্রায় ৩০,০০০ ৯. জলজ বাস্তুতন্ত্রের উপর প্রভাব বিশেষ করে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মতো অঞ্চলে নদী ও জলাশয়গুলি জীববৈচিত্র্যের আধার। মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীর শিকার বা আহরণ যদি বিজ্ঞানসম্মত না হয়, তবে তা পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্রকে নষ্ট করে দেয়। অতিরিক্ত মাছ ধরা, নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার, বা নির্দিষ্ট প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা জলজ সম্পদকে বিপন্ন করে তোলে। এই ধরনের 'শিকার' সংরক্ষণের পরিপন্থী। ১০. বিকল্প খাদ্যের সহজলভ্যতা শিকারকে প্রায়শই খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করা হয়, বিশেষ করে গ্রামীণ বা আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য। কিন্তু আধুনিক যুগে, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মতো অঞ্চলে, চাল, ডাল, বিভিন্ন শাকসবজি (যেমন সরিষা শাক), এবং মাছের মতো খাদ্যের সহজলভ্যতা অনেক বেশি। প্রাণিজ আমিষের জন্য পশু বা মাছ শিকারের উপর নির্ভরতা কমেছে। তাই খাদ্যের অজুহাতে শিকারকে সংরক্ষণের নাম দেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। ১১. বিকল্প সংরক্ষণ পদ্…